গুগলের গল্প

0 18

স্ট্যানফোর্ডে এসে ল্যারি পেজের সাথে পরিচয় হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের আরেক ছাত্র সার্গেই ব্রিনের। তারা তখন একসাথে একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করা শুরু করেন। তারা বিভিন্ন ওয়েবের লিংকগুলো সংগ্রহ করতেন। তারপর একটি অ্যালগরিদমের সাহায্যে ওয়েবসাইটের গুরুত্ব অনুযায়ী র‍্যাংকিং করেন। এই অ্যালগরিদমকে বলা হতো ‘পেজর‍্যাংক’। এভাবে তারা একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেন, যাতে সার্চ দিলে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ওয়েবসাইটগুলোর লিংক চলে আসতো। সার্চ ইঞ্জিনটির নাম দেয়া হয় ‘ব্যাকরাব’। তারা এই সার্চ ইঞ্জিনের প্রথম সংস্করণ নিয়ে আসে ১৯৯৬ সালের আগস্টে স্ট্যানফোর্ডের ওয়েবসাইটে। তারা চেয়েছিলেন এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে, যার মাধ্যমে অন্য ওয়েবপেজগুলোর একটি তুলনামূলক তালিকা করা যাবে। এর ভিত্তি হবে অন্য ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে কতজন তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন। তাদের তত্ত্ব ছিল তখনকার কৌশলগুলোর চেয়ে নতুন কৌশলে কোনো একটি অনুসন্ধান ইঞ্জিন বানানো, যেটি ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে ফলাফল দেখায় তাহলে আরও ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। ল্যারি পেজ ও সার্গেই ব্রিন ১৯৯৭ সালে সার্চ ইঞ্জিনের নতুন নাম দেন ‘গুগল’। গুগল নামটি নেয়া হয় একটি গাণিতিক শব্দ থেকে, যা দিয়ে বোঝানো হতো ১ এর পর ১০০টি শূন্য। তাদের মতে এটি সার্চ ইঞ্জিনের তথ্য ভান্ডারের বিশালতা নির্দেশ করে। শুরুতে ল্যারি পেজ বা সার্গেই ব্রিন কারোরই গুগলকে নিয়ে ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল না। তারা একাডেমিক দিকেই মনযোগী ছিলেন। তাই গুগলকে চাইলেন বিক্রি করে দিতে। তখন সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন কোম্পানি ছিল ‘ইয়াহু!’। ১৯৯৭ সালে তারা ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে গুগলকে কেনার জন্য ইয়াহুকে প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইয়াহু ফিরিয়ে দেয়। মজার ব্যাপার, ২০০২ সালেও তারা ইয়াহুর কাছে গুগলকে বিক্রি করার চেষ্টা করেন। তখনও তারা ফিরিয়ে দেয়।প্রথমবার ইয়াহু থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তারা স্ট্যানফোর্ডের অধ্যাপকদের ও সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। ১৯৯৮ সালের আগস্টে ‘সান মাইক্রোসিস্টেম’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি বেখটলশেইম গুগলকে এক লাখ ডলার দেন। গুগলের প্রথম কার্যালয়ে তখন কাজ শুরু হয়। এই কার্যালয়টি ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানলো পার্কের একটি গ্যারেজে। গ্যারেজটি ছিল পেজ ও ব্রিনের বন্ধু সুসান ওজস্কির বাড়ির। সুসান বর্তমানে ইউটিউবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যারেজ থেকে পালো আল্টোর এক সাইকেলের দোকানের উপরের তলায় নতুন কার্যালয় নেয়া হয়। এর সাত মাস পরই মাউন্টেন ভিউয়ে নতুন কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মাউন্টেন ভিউয়ে গুগলের মূল কার্যালয়কে বর্তমানে ‘গুগল প্লেক্স’ বলে ডাকা হয়। গুগল কোম্পানি বড় হওয়ার সাথে সাথে এর বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। তখন পেজ ও ব্রিন ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পান। শুরু থেকে পেজ ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আর ব্রিন ছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শর্ত দেন, তখনকার ২৬ বছর বয়স্ক ল্যারি পেজকে নির্বাহী পদ থেকে সরে যেতে হবে। তাঁর জায়গায় অভিজ্ঞ কাউকে আনা হবে। ল্যারি সেই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন। তখন সফটওয়্যার কোম্পানি ‘নভেল’ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন এরিক স্মিট। তাঁকে গুগলে আনা হয় ল্যারি পেজের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য। গুগল সার্চ ইঞ্জিনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় ২০০৪ সালে গুগল শেয়ার বাজারে নাম লেখায়। এতে করে ল্যারি পেজ ও সার্গেই ব্রিন- দুজনই বিলিয়নিয়ার হয়ে যান। পেজ সিইও থেকে সরে দাঁড়ালেও ভোটাধিকারের ক্ষমতা ও সর্বোচ্চ অংশের শেয়ার তাদের দুজনেরই ছিল। সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ানোয় পেজ অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবে এই সময়টা তিনি অন্যদিকে মন দেন। ল্যারি পেজ শুরু থেকেই চাইতেন গুগলের কাজ যেন শুধু সার্চ ইঞ্জিনেই সীমাবদ্ধ না থাকে। ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলতে পারে এমন জিনিসের প্রতি তাঁর বরাবরই আগ্রহ ছিল। তিনি চাইলেন মানুষের পকেটের মধ্যে কম্পিউটারকে পৌঁছে দিতে। তিনি ২০০৫ সালে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে একটি কোম্পানি কেনেন। এর নাম ছিল ‘অ্যান্ড্রয়েড’। অ্যান্ড্রয়েডের সিইও ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অ্যান্ডি রুবিন। পেজ তখন রুবিনের সাথে প্রায়ই আলাপে বসতেন। এরিক স্মিট বা সার্গেই ব্রিন কেউই পেজের এই ধারণা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। গুগলের মতো বড় কোম্পানির কাছে ৫০ মিলিয়ন ডলার তেমন কিছু নয়। তাই এরিক স্মিট এটা নিয়ে আর মাথা ঘামাননি। পরবর্তী দুই বছরে রুবিন মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম ডেভেলপের কাজ করেন। এ সময় ‘ঝামেলা’ সৃষ্টি করেন স্টিভ জবস। ২০০৭ সালে স্টিভ জবস আইফোন নিয়ে আসলে মোবাইল ফোনের বিপ্লব সৃষ্টি করে। রুবিন তখন মনে করেন। অ্যান্ড্রয়েড নিয়ে আরো কাজ করতে হবে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে টি মোবাইল সর্বপ্রথম রুবিনের অ্যান্ড্রয়েড চালিত মোবাইল ফোন নিয়ে আসে। উর্ধ্বমুখী যেকোনো মোবাইলের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ২০০৯ সালে অ্যান্ড্রয়েডচালিত ফোনের বিক্রি ছিল ১.৮%। ২০১০ সালে তা হয় ১৭.২%। ফলে প্রথমবারের মতো অ্যাপলের আইফোন বিক্রিকে (১৪%) ছাড়ানো সম্ভব হয়। সার্চ ইঞ্জিন ও অ্যান্ড্রয়েডের সফলতায় গুগলের বিজ্ঞাপন বাণিজ্য ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী হতে থাকে। ২০১০ সালে গুগল ১৮০ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হয় এবং এর কর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪,০০০। সার্চ ইঞ্জিনের সফলতায় এরিক স্মিটের অনেক অবদান থাকলেও অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে ল্যারি পেজ স্মিটের কাছ থেকে কোনো সহায়তা নেননি। এটাই তাঁকে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।গুগল বড় কোম্পানি হওয়ার সাথে সাথে কিছু সমস্যাও দেখা দেয়। আগে যেখানে কোনো প্রকল্পে ১০ জন কাজ করত, এখন সেখানে ২০-৪০ জন কাজ করা শুরু করে। ফলে আমলাতান্ত্রিক কিছু জটিলতা দেখা দেয়। এছাড়া গুগলের জন্য বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায় ফেসবুক। গুগলের দক্ষ অনেক কর্মীই ফেসবুকে যোগ দেয়া শুরু করেন। ২০১০ সালে ফেসবুকের ১,৭০০ কর্মীর ১৪২ জনই ছিলেন গুগলের সাবেক কর্মী। ল্যারি পেজ তখন এই সমস্যা মোকাবেলায় গুগলে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ২০১১ সালে এরিক স্মিট সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে দশ বছর পর নিজের পদ ফিরে পান ল্যারি পেজ। তিনি তখন হার্ডওয়্যার পণ্যের দিকে মন দেন। ২০১২ সালে ১২.৫ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘মটোরলা’ মোবাইল কোম্পানি কিনে নেন, যদিও পরে একে লেনোভোর কাছে বিক্রি করে দেন। এছাড়া গুগল থেকে ল্যাপটপ ক্রোমবুক, মোবাইল ফোন গুগল পিক্সেল ও গুগল গ্লাস নিয়ে আসেন। ওয়েব ব্রাউজার গুগল ক্রোম ও ফেসবুকের সাথে পাল্লা দেয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘গুগল প্লাস’ আনা হয়। কিন্তু গুগল প্লাস ফেসবুকের মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। বর্তমানে ইন্টারনেটের সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা সাইট হচ্ছে গুগল। ৪০টি দেশে এর ৭০টি কার্যালয় রয়েছে। ২০১২ সালে কানসাস শহরে গুগল থেকে ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সার্ভিস শুরু হয়। এতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের চেয়ে ১০০ গুণ দ্রুত ইন্টারনেট সেবা বিনামূল্যে দেয়া হয়। ২০১৫ সালে গুগলের ব্যবস্থাপনায় আসে বড় পরিবর্তন। গুগলের জায়গায় নিয়ে আসা হয় ‘অ্যালফাবেট’। অ্যালফাবেটের অধীনে চলে আসে গুগলসহ এর অধীনে থাকা সব কোম্পানি। ল্যারি পেজ তখন অ্যালফাবেটের সিইও পদে চলে আসেন। গুগলের নতুন সিইও হন সুন্দর পিচাই। বর্তমানে অ্যালফাবেটে থেকেই গুগলসহ এর অধীনের অন্যান্য কোম্পানি দেখভাল করছেন ল্যারি পেজ। তিনি বর্তমানে উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করছেন।

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.