খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে।

0 17

বিশ্বে খেলাধুলা বলতে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বলিবল, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল, জিমন্যাটিকস, টেবিল টেনিস, স্কোয়াশ, হাডুডুুডু, ব্যাডমিন্টন, এ্যথলেটিকস, সাতার, জুডো, ক্যারাটে, কুংফু, বক্সিং, কুস্তি, ভারোত্তোলন, শ্যূটিং, ওয়াটার পোলো, দাবা, ছক্কা-পাঞ্জা, গাফলা, তাস, ক্যারাম, দাড়িয়া বাধা, লাঠিখেলা, নৌকা বাইছ, গোল্লাছুট, ষাড়ের লড়াই প্রভৃতি খেলাধুলায় ধার্মিক-অধার্মিক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, অতিশিক্ষিতরা শহর-নগর, পাড়া-মহল্লা, গাও-গ্রামে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের জনপ্রিয় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের জীবন যাপনের পাশাপাশি বিনোদন ও সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ দেয়। বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম খেলাধুলা। সুস্থ শরীর ও সুন্দর মন পরস্পর পরিপূরক। তাই ইসলাম এ বিষয়টির প্রতিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়াও ইসলাম নিথর-নির্জীব জীবনবোধের বদলে ইবাদতের মাধুর্যে শরীর-স্বাস্থ্যের বিকাশকে উৎসাহ দেয়। খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক বিষয়াবলীকে ইসলাম ধর্মে খুব সর্তকতার সঙ্গে মূল্যায়ণ করা হয়েছে। খেলা যখন খেলায় এবং বিনোদন যখন বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন ইসলাম এমন খেলা ও বিনোদনে বাধা দেয় না। কারণ খেলাধুলা পৃথিবীর আদিকাল থেকে শিশু-কিশোরদের মজ্জাগত স্বভাব ছিল ও আছে। এটা সর্বজন স্বীকৃত একটি বিষয়। কিন্তু যখন এটাকে ব্যবসায়িক রূপ দেয়া হয়, যুবক-যুবতীরা খেলার নামে অশ্লীলতা ছড়ায় আর কিছু মানুষ এতে আসক্ত হয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করে তখন তাতে নিষেধাজ্ঞা চলে আসে। বর্তমান আলোচনায় আমরা তুলে ধরবো খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে।ইসলামপূর্বযুগে খেলাধুলা, মেলা ও জোয়া ভিত্তিক অনেক প্রকারের খেলাধুলার প্রচলন ছিল, শরিয়াতের বিধান লঙ্ঘিত হওয়ায় অনেকগুলোকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যার বর্ণনা কোরআন-সুন্নাহ ও ফেক্বাহ শাস্ত্রে বিদ্যমান আছে। তবে হ্যাঁ! শরীয়তের সীমারেখার ভেতরে উল্লিখিত শর্তের সাথে শরীর চর্চা, সাময়িক সময়ে হাসিখুশি, তীরন্দাজ, যুদ্ধকৌশল ও রনক্ষেত্রে জয়লাভের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক দৌড়া-দৌড়ির বৈধতা বিভিন্ন হাদীসে ও ফেকাহগ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে এগুলো খেলাধুলার অন্তর্ভুক্ত কি না এ নিয়েও পক্ষে বিপক্ষে বিতর্ক আছে। ইসলামি পরিভাষায়, খেলাধুলা ক্রিড়া-কৌতুক এমন সব কাজ বস্তু বা বিষয়কে বলা হয় যা মানুষকে আল্লাহর এবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে ফেলে। যার কোন উল্লেখযোগ্য উপকারিতা নেই কেবল সময় ক্ষেপন কিংবা মনোরঞ্জনের জন্য করা হয়। খেলাধুলা ও কৌতকাবহ বস্তুর বর্ণিত সংজ্ঞার ভেতরে যত কাজ, যত কথা, বস্তু ও বিষয় ঢুকবে, সবগুলোকে শরিয়ত অনুমোদন দেয়নি। সূরা লুকমানের ৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মানুষের মধ্যে এক শ্রেণির মানুষ এমন আছে, যারা লাহওয়াল হাদীস তথা খেলাধুলা-কৌতুকাবহ কথা ক্রয় করে মানুষকে আল্লাহর পথ পদ্ধতি থেকে ভ্রষ্ট করার জন্য। আর এটা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবনামনাকর শাস্তি’। প্রথম লক্ষণীয় যে, কুরআন কেবল নিন্দার স্থলেই খেলাধুলা, ক্রিড়া-কৌতুকের উল্লেখ করেছে। এই নিন্দার সর্ব নিম্ন পর্যায় হচ্ছে মাকরুহ, আলোচ্য আয়াতটি খেলাধুলা ও অনর্থক কাজের নিন্দায় সুম্পষ্ট ও প্রকাশ্য। (রূহুল মাআনী, কাশ্শাফ) বিংশ শতাব্দির প্রখ্যাত মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ শফী র. তাঁর ‘আহকামুল কুরআনে’ বর্ণিত আয়াতের হুকুম প্রসঙ্গে বলেন- পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে ঐ সকল কথা, কাজ, বস্তু ও বিষয়কে হারাম করে যা মানুষকে আল্লাহ পাকের এবাদত ও তার স্মরণ থেকে গাফিল করে দেয়। তা গান-বাজনা হোক বা খেলাধুলা, ক্রিড়া-কৌতুক, মেলা, জোয়া সরঞ্জামসহ সবই এর অন্তর্ভুক্ত। বর্ণিত আয়াতে অধিকাংশ তাফসীরের কিতাবে “লাহওয়াল হাদীস” এর ব্যাখ্যায় খেলাধুলা-ক্রিড়া-কৌতুক, আজে-বাজে কথাবার্তা, ছায়াছবি-নাটক, অশ্লীল উপন্যাস, কেচ্ছা-কাহিনী, গান-বাজনা ইত্যাদি যা মানুষকে আল্লাহর এবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেলা করে তা হারাম সাবস্ত্য করেছেন। বিশ্ব বিখ্যাত ফেকাহ শাস্ত্রীয় কিতাব ‘হেদায়া’র মধ্যে বলা হয়েছে চৌদ্দ গুটির খেলা মাকরুহে তাহরীমী, কারণ এর দ্বারা জোয়া খেলা খেললে তা হবে মাইসির। আর মাইসির অকাট্য হারাম, পবিত্র কোরআন হাদীসের আলোকে। মাইসির হচ্ছে যে কোন জোয়া খেলার নাম, আর যদি এর দ্বারা জোয়া না খেলে তাহলে এটা হবে নিরর্থক লাভহীন এক কাজ। পৃথিবী বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব ‘দুররে মুখতার’ গ্রন্থকার বলেছেন যে কোন খেলাধুলা বৈধহওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে, তাতে হার জিতের ওপর কোন বাজি ধরা যাবে না। জোয়ার চুক্তি করা যাবেনা। খেলার অধ্যবসায় সদা-সর্বদা করা যাবেনা। জীবনের আদর্শ উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট হিসেবে একে আজীবন করা যাবেনা। খেলাধুলার কারণে ইসলামের অনুশাসন বাস্তবায়নে কোন প্রকার বাধা সৃষ্টি হতে পারবে না। নতুবা তা হারাম হওয়ার বিষয়ে ফকীহগণ একমত। ফতোয়ায়ে দুররে মুখতারে খেলাধুলার একটি মূলনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো খেলাধুলা তখন জায়েজ হবে যখন তাতে জুয়া থাকবেনা। খেলার অধ্যবসায় সদা-সর্বদা করা যাবেনা। এটাকে জীবনের উদ্দেশ্য, আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য মনে করা যাবেনা। সেই সাথে খেলাধুলার কারণে ইসলাম ধর্মের অনিবার্য বিধান লংগিত হতে পারবেনা। অন্যতায় তা হারাম হওয়ার ব্যপারে ফকীহগণ একমত। (খেলাধুলা ও আনন্দমেলা-মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর) কোন কোন হাদীস ও ফেকহার কিতাবে যেসব খেলাধুলার বৈধতা দেয়া হয়েছে তা হলো- হযরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসূল সা. পবিত্র মদীনায় খেলাধুলায় মগ্ন একদল ছেলেদের কাছে গিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। আর আমি তাঁর কাঁধদ্বয়ের ফাঁক দিয়ে তাদের খেলা দেখলাম, রাসূল সা. বললেন, খেলাধুলা কর হে আরিফের বৎসগণ! এতে ইয়াহুদি ও নাসারাগণ আমাদের শরীয়তে আনন্দোদ্দীপনার সুযোগ আছে বলে জানতে পারবে, ছেলেরা বলতে লাগলো ধন্যবাদ আবুল কাসিম, ধন্যবাদ ইতোমধ্যে হযরত ওমর রা. আসায় সকলে মাঠ ত্যাগ করে চলে গেল। আরেক হাদীসে আল্লাহর রাসূল সা. বলেন- তিন খেলাই মুসলমানদের- এক. আপন স্ত্রীর সাথে অত্যাধিক প্রেমভরে খেলা করা। দুই. স্বীয় অশ্বকে যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেয়া। তিন. শত্রুর মুকাবেলায় জয় লাভের জন্য তীর ছুড়া ছুড়ির প্রশিক্ষণ। (তিরমিজী, আবু দাউদ, ইবনে মাযা) কানজুল উম্মাল নাকম কিতাবে আরেকটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো- (তোমরা মাঝে মধ্যে) খেলাধুলা কর, কারণ আমি তোমাদের জীবন ব্যবস্থায় সম্প্রীতির অভাব অপছন্দ করি। ইমাম আবু দাউদ স্বীয় মারাসীল গ্রন্থে এক হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, মাঝে মধ্যে মনকে আরাম দাও, অবকাশে থাক। জামে ছগিরের এক হাদীসে উল্লিখিত- আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, আল্লাহর যিকির-আযকার ব্যতীত যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান খেলাধুলার অন্তর্ভূক্ত। খেলাধুলা জায়েজ-নাজায়েজ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসিন ও ফুকাহায়ে কেরামগণ বলেছেন, ইসলামী শরীয়তে নির্ধারিত কোন খেলাধুলা নেই। সেই সাথে নির্ধারিত কোন নিয়ম কানুনও নেই। বরং দ্বীন ইসলাম, ব্যক্তির শারীরিক ও আর্থিক স্বার্থ বিরোধী খেলা এবং জুয়া ভিত্তিক যাবতীয় খেলাধুলা নিষিদ্ধ ও হারাম। মোটকথা খেলাধুলা হারাম হওয়ার কারণ সমূহের মধ্যে থেকে প্রধান কারণ হিসেবে যে ক’টিকে সনাক্ত করে বৈধ বা অবৈধ হুকুম লাগিয়েছেন তা নিম্নরূপ (ক) দু’তরফা লেনদেন ও হার জিতের বাজি খেলা বা জোয়া খেলা করা। (খ) আল্লাহর জিকির আযকার ও তার স্মরণ থেকে মানুষকে গাফিল করা। (গ) বেশিরভাগ অধার্মিক ও অসাধু লোকজনের আড্ডা জমে উঠা। (ঘ) খেলার অধ্যবসায় সদা-সর্বদা করা। (ঙ) শারীরিক ক্ষতি সাধিত হওয়া। (চ) আর্থিক ক্ষতি সাধন হওয়া। এগুলো যে খেলায় পাওয়া যাবে সেটা হারাম ও নিষিদ্ধ আর না পাওয়া গেলে বৈধ।

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.