ইন্টারনেট ব্যবহার হোক সবার জন্য উন্মুক্ত

0 13

বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত আয়ের ওপর নির্ভর করেই ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। এই শিল্পের টেকসই নিশ্চিত তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্য ব্রডব্যান্ড প্রত্যেক বাংলাদেশি নাগরিকের আইনি অধিকার ঘোষণা করা অতীব জরুরি।

এক্ষেত্রে নিম্নে প্রদেয় তথ্য, উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেন’স চার্টার) ভিশনের (সাশ্রয়ী, সার্বজনীন এবং নির্ভরযোগ্য টেলিযোগাযোগ সেবা) কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে যথাযথ সময়োপযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও আজ অবধি ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকারীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। এর বহুবিধ কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে-

প্রথমত, বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে (গ্রামীণফোনের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা ৭ কোটি ৬৪ লাখ ৬২ হাজার, রবির ৪ কোটি ৯০ লাখ ৪ হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৫২ লাখ ৩৯ হাজার)।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর হিসেবে ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠান টেলিটকের গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে গাণিতিক হারে। তবে পরবর্তী কালে সে সংখ্যায় ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।

বর্তমান অপারেটরটির গ্রাহক সংখ্যা ৪৮ লাখ ৬৮ হাজার (সূত্র যুগান্তর ৩০ জানুয়ারি ২০২০) যদিও ২০২০ সালে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ লাখ (সূত্র ডেইলি স্টার ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯)। এই প্রথম কারণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে-

(১) সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাষায় টেলিটক সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে পাবলিক পলিসির দুটি লেভেলের একটি লেভেল (পলিসি ফর পাবলিক ইন জেনারেল) ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠান পাবলিক পলিসির দুটি লেভেলের (পলিসি ফর পাবলিক এবং পলিসি ফর বিজনেস) সময়োপযোগী ব্যবহার করেছে।

(২) লিনিয়ার অর্থনীতি বিজ্ঞজনদের মতে, বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান যেমন রবি তাদের ব্যবসার প্রমোশনাল মিক্স ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে লিনিয়ার প্রোগ্রামিং কৌশল অবলম্বন করেছে। পক্ষান্তরে টেলিকম প্রমোশনাল মিক্স ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কৌশল অবলম্বন করতে নিজেদের স্বদিচ্ছা বা অপারগতা প্রকাশ করেছে।

 

দ্বিতীয়ত সার্কুলার অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প থেকে রাজস্ব আদায়ে বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতার জন্য ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকারীদের পোহাতে হয় বা হচ্ছে দুর্ভোগ।

কারণ বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মুনাফা ঠিক রাখার জন্য সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে গ্রাহকের ডিমান্ডস অব ফেয়ারনেসের জায়গা সংকুচিত করে ফেলে।

রাষ্ট্র যখন রাজস্ব আদায়ে পরোক্ষভাবে বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা প্রদান করে থাকে, তখন ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির গ্রাহকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

যেমন বেশি রাজস্ব আদায়ে যুক্তি দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, তার মতে, বর্তমানে মোবাইল কলরেটের হার এত কম যে, অপ্রয়োজনীয় কথা বলার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে কথা বলতে বলতে ট্রেনের সঙ্গে এক্সিডেন্ট করার ঘটনাও আছে (সূত্র যুগান্তর, ২৬ জুন ২০২০)।

প্রসঙ্গত, ফিনল্যান্ডসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে অনেক মানুষ গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইলে কথা বলতে গিয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। তাই বলে উন্নত দেশগুলো বেশি রাজস্ব আদায়ে এই ধরনের উদাহরণ আমলে নেয় কিনা তা ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ভেবে দেখা উচিত বললে অত্যুক্তি হবে না।

তৃতীয়ত, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিস্ময়করহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণ, বর্তমান বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৩২ লাখ ৫৩ হাজার (সূত্র প্রথম আলো, ১৪ মে ২০২০) এবং মোবাইল গ্রাহক ১৬ কোটি ২৯ লাখ (প্রিয় ডটকম, ১৯ জুন ২০২০)।

বাংলাদেশের ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প সার্কুলার ব্যবসা মডেলকে দূরে রাখার জন্য এত বিপুল সংখ্যক গ্রাহক থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের নিজস্ব মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান দেশের শীর্ষ স্থান দখল করতে পারেনি।

অন্যদিকে বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে লিনিয়ার ব্যবসা মডেল ব্যবহার করলেও নিজেরা সার্কুলার অর্থনীতির ব্যবসার দর্শনকে ব্যবহার করে নিজ দেশে মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ স্থান দখল করেছে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান রবির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রবি, দু’টি বিদেশি কোম্পানির (মালয়েশিয়ার আজিয়াটা গ্রুপ ও ভারতের এয়ারটেল) যৌথভাবে পরিচালিত একটি বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান।

টেলিকমকে রাজস্ব আদায়ে স্বনির্ভর করার ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান রবি থেকে শিক্ষা নিয়ে, সার্কুলার অর্থনীতির মডেলকে ফোলো করার ওপর নির্ভর করছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেন’স চার্টার) ভিশনের সত্যিকারে সাফল্যতা।

 

চতুর্থত, অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য দেশের মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব গ্রাহকদের কাছে ইন্টারনেটের গতি বিক্রির পরিবর্তে লিমিটেড মেগাবাইট বিক্রি করে। যেখানে মিউচ্যুয়াল বেনিফিসিয়াল কো-অপারেশন নামক ব্যবসায়িক নীতি গ্রাহকের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়- এটাই লিনিয়ার ব্যবসা মডেলের দর্শন।

ফলশ্রুতিতে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প ব্যবহারকারীদের পড়তে হয় সমস্যায় এবং পোহাতে হয় এবং হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গত ১৯ জুলাই ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ছবি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার দাবি রাখে।

 

মোদ্দাকথা, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বর্তমান বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৩২ লাখ ৫৩ হাজার। অর্থাৎ বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক পাঁচটি চাহিদার (মাসলস হায়ারার্ক অফ নিডস তত্ত্ব মতে) সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন একটি মৌলিক চাহিদা, যা ইন্টারনেট।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রত্যেক বাংলাদেশি নাগরিকের আইনি অধিকার ঘোষণা করার মাধ্যমে মানুষের নতুন মৌলিক চাহিদা পূরণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ফিনল্যান্ডের উদাহরণ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ডক্টরেটর্স প্লাটফর্ম ইন ফিনল্যান্ডের সহযোগিতা নিতে পারে।

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.