সর্বকালের সেরা ধনী জেফ বেজোস অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা

0 17

আমার মা জ্যাকির বয়স যখন মাত্র ১৭ বছর, তখন আমার জন্ম। তখন তিনি নিউ মেক্সিকোর আলবুকারকি শহরের মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রী। ১৯৬৪ সালের আলবুকারকিতে মাধ্যমিকে পড়ুয়া কোনো কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়া মোটেও স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। মায়ের জন্য সেই সময় ছিল সংগ্রামের। তাঁকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঠিক তখনই মায়ের পাশে এসে দাঁড়ান আমার নানা। অনেক দেনদরবারের পর অধ্যক্ষ বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, সে স্কুলে পড়তে পারবে। কিন্তু ক্লাসের বাইরে সে স্কুলের কোনো সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না বা ক্লাসের বিরতির ফাঁকে কোনো লকারও ব্যবহার করতে পারবে না।’ আমার নানা তাতেই রাজি হয়ে গেলেন। এভাবেই মা তাঁর মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করেন। যদিও ডিপ্লোমা সনদ নেওয়ার জন্য সমাবর্তনের দিন মাকে মঞ্চ উঠতে দেওয়া হয়নি; কিন্তু পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। মাধ্যমিকের পর মা একটি নৈশ স্কুলে ভর্তি হন। বেছে বেছে মা সেই কোর্সগুলোই নিতেন, যে ক্লাসে নবজাতকে নিয়ে বসা যাবে। বড় দুটো ব্যাগ নিয়ে তাঁকে প্রতি রাতে ক্লাসে যেতে হতো। একটা ব্যাগে থাকত বই-খাতা, আরেকটায় ডায়াপার, দুধের বোতল আর আমাকে ব্যস্ত রাখার মতো কিছু খেলনা।

আমার বাবার নাম মিগাইল। তিনি আমাকে দত্তক নেন, যখন আমার বয়স মাত্র ৪। কাস্ত্রোর শাসনামল শুরুর পরপরই অপারেশন পেদ্রো প্যানের অংশ হিসেবে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবা কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। বাবাকে একা আমেরিকায় আসতে হয়েছিল। বাবার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ে ছিলেন তাঁর মা-বাবা। তাঁদের ধারণা ছিল আমেরিকায় বাবার জীবন নিরাপদ হবে। তাই তাঁর মা তাঁকে আমেরিকায় পাঠানোর আগে ঘর পরিষ্কার করার কাপড় দিয়ে একটা জ্যাকেট বানিয়ে দেন। কারণ, সে সময় এর বেশি সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। এখনো আমার মা-বাবার বাড়ির ডাইনিংরুমের দেয়ালে ঝোলানো আছে সেই জ্যাকেট। আমেরিকায় ঢুকে বাবাকে দুই সপ্তাহ ফ্লোরিডার শরণার্থীশিবির ম্যাটকুম্বে থাকতে হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় একটি ক্যাথলিক আশ্রমে। তিনি সৌভাগ্যবান ছিলেন, ইংরেজি না জেনেও সে সময় এমন ক্যাথলিক মিশনে ঠাঁই পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সফরটা ছিল অনেক কঠিন। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে একজন মানুষ এতটা কঠিন পথ পাড়ি দিতে পারেন। সেই মিশনারিতে পড়ে বাবা আলবুকারকির একটা কলেজ থেকে বিশেষ বৃত্তি পান, সেখানেই আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়। জীবন আমাদের নানা সময়ে নানা ধরনের উপহার দেয়। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার আমার মা ও বাবা। আমার ও আমার ভাইবোনের জন্য তাঁরা দুজন হলেন জীবনের একমাত্র অনুপ্রেরণা।

জীবনবিষয়ক শিক্ষা আমরা মা-বাবার চেয়ে দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকেই বেশি পাই। আমি খুব সৌভাগ্যবান ছিলাম। কারণ, ৪ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি গ্রীষ্মকাল আমি আমার নানা-নানির সঙ্গে টেক্সাসে তাঁদের খামারবাড়িতে কাটানোর সুযোগ পেতাম। নানা ছিলেন সরকারি চাকুরে এবং খামারি। তিনি প্রচণ্ড আত্মনির্ভরশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ লোক ছিলেন। কেউ যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো বিপদে পড়ে, তখন চাইলেই কিন্তু সে ফোন উঠিয়ে সাহায্য চাইতে পারে না। নিজেকেই বের করতে হয় সমস্যার সমাধান। ছেলেবেলায় আমি আমার নানাকে দেখতাম, একেক দিন একেক ধরনের সমস্যার সমাধান করছেন। কোনো দিন মাটি তোলার ক্রেন মেরামত করতে দেখতাম, কোনো দিন দেখতাম পশু চিকিৎসক হয়ে নিজেই নিজের খামারের পশুর পরিচর্যা করছেন। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি, চাইলে কঠিন থেকেও কঠিন সমস্যার সমাধান নিজে করা যায়। ধাক্কা খেলেই আবার চেষ্টা করার তাড়না পাওয়া যায়, ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন নতুন উপায় আবিষ্কার করা যায়; থেমে থাকলে নয়।

ছেলেবেলাতেই নানার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো আমার ভেতর গেঁথে গিয়েছিল। সেই শিক্ষাকে পুঁজি করেই কিশোরকালে আমি ‘গ্যারেজ ইনভেন্টর’ হয়ে গিয়েছিলাম। বাড়ির গ্যারেজে বসে বসে আমি সে সময় টায়ারে সিমেন্ট ভরে ‘অটোমেটিক গেট ক্লোজার’ (স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা বন্ধ করার যন্ত্র) তৈরি করেছিলাম। ছাতা আর টিন ফয়েল দিয়ে বানিয়েছিলাম সৌরচুলা। আরও বানিয়েছিলাম বেকিং ট্রে দিয়ে একটা বিশেষ অ্যালার্ম; ভাইবোনদের বোকা বানানোর জন্য।

১৯৯৪ সালে আমাজনের ভাবনা আমার মাথায় আসে। পরিকল্পনাটা ছিল কয়েক লাখ বই নিয়ে একটা অনলাইন দোকান খোলার। পৃথিবীতে তখন এই বইয়ের দোকানের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেই সময় আমি নিউইয়র্কের একটা পুঁজি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। যখন আমার বসকে বললাম আমি আর চাকরি করব না, তিনি আমাকে সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে নিয়ে গেলেন। আমার সব কথা শোনার পর বললেন, ‘জেফ, তোমার বুদ্ধিটা খুবই ভালো। কিন্তু এই পরিকল্পনা তাঁদের জন্য খুবই উপযুক্ত, যাঁদের কাছে ভালো চাকরি নেই।’ চাকরি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি আমাকে দুদিন ভেবে দেখার জন্য সময় দিলেন। কিন্তু আমি মন থেকে সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছিলাম, তাই আর মাথা দিয়ে ভাবিনি। আমি চেয়েছিলাম, আমার বয়স যখন ৮০ হবে, তখন জীবনে আফসোসের সংখ্যা যেন খুব কম থাকে। আর আফসোস হয় তখনই, যখন আমরা সুযোগ পেয়েও নতুন কিছুর চেষ্টা করি না, নতুন পথে হাঁটি না।

আমাজন ডটকমের প্রথম পুঁজির বিনিয়োগ আসে আমার মা-বাবার কাছ থেকে। তাঁরা এমন একটা পরিকল্পনার পেছনে তাঁদের জীবনের সব সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছিলেন, যেটার ব্যাপারে তাঁদের ন্যূনতম ধারণা ছিল না। তাঁরা আমাজন কিংবা ইন্টারনেটে চালু হওয়া কোনো দোকানের ওপর বিনিয়োগ করে বাজি ধরেননি। তাঁরা বাজি ধরেছিলেন তাঁদের ছেলের স্বপ্নপূরণের। তাঁদের বলেছিলাম, এই টাকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা ৭০ শতাংশ। কিন্তু এ নিয়ে তাঁদের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। এরপর বাকি ১০ লাখ ডলারের পুঁজি জোগাড় করতে আমাকে ৫০টিরও বেশি মিটিং করতে হয়েছে। আর প্রায় প্রতিটি মিটিংয়েই সে সময় ঘুরেফিরে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে, ‘এই ইন্টারনেট জিনিসটা কী?’

একটা স্থিতিশীল মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরি ছেড়ে আমি সিয়াটলের একটা গ্যারেজে আমার স্টার্টআপ সাজিয়ে বসি। পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম, আমি সফল হব না। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা, নিজে গাড়ি চালিয়ে পোস্ট অফিসে প্যাকেজ নিয়ে যাচ্ছি ডেলিভারির জন্য। আর গাড়ি চালাতে চালাতে স্বপ্ন দেখছি যেদিন অনেক টাকা হবে, সেদিন একটা ফর্কলিফট (মাল তোলার স্বয়ংক্রিয় গাড়ি) কিনব।

 

প্রতিষ্ঠার দিন থেকে আমাদের কোম্পানির মূল নীতি হচ্ছে ‘ডে ওয়ান’ মানসিকতা বজায় রাখা। এর মানে হলো আমাদের আচরণ, কর্মশক্তি আর বৈশিষ্ট্য হবে এক দিন বয়সী একটি প্রতিষ্ঠানের মতো—তরুণ, উদ্দীপ্ত ও প্রাণবন্ত। আজ আমাজন বড় একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এখনো আমি বিশ্বাস করি, নিজের ডিএনএতে যদি এই ‘ডে ওয়ান’ মানসিকতাকে গেঁথে নিই, তাহলে আমাদের উদ্দীপ্ততা হবে একটা তরুণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মতোই প্রাণশক্তিতে ভরপুর।

আমার মতে, সব সময় ভোক্তার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টায় উদ্‌গ্রীব থাকা হলো ‘ডে ওয়ান’ মানসিকতা বজায় রাখার উৎকৃষ্ট উপায়। কেন? কারণ, কাস্টমার সব সময়ই বিস্ময়করভাবে অতৃপ্ত। এমনকি যখন তারা পণ্য ও সেবা পেয়ে খুশি হয়, তখনো অতৃপ্ত থাকে। কাস্টমারদের আস্থা অর্জন করা কঠিন, হারানো খুব সহজ। আমরা তাই ধীরগতিতেই আস্থা অর্জনের চেষ্টা করি। সময় নিয়ে ছোট ছোট কিন্তু কঠিন কাজও করি—যেমন: সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া, প্রতিদিন আগের দিনের চেয়েও স্বল্প মূল্যের অফার দেওয়া, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, নীতিতে অবিচল থাকা এবং কাস্টমারদের পরিবারের সঙ্গে কাটানো একান্ত সময়ের কথা ভেবে তাদের পণ্য কেনার পেছনে যেন কম সময় ব্যয় হয়, সেই ব্যবস্থা করা। আর এভাবেই আমাজন একটু একটু করে ভোক্তার আস্থার জায়গায় পৌঁছেছে।

একটি কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, আমাজনকে কঠোর জবাবদিহির মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত। প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, লাভজনক-অলাভজনক সংগঠন—জবাবদিহির চর্চা সবার করা উচিত। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই জবাবদিহির কাঠগড়া থেকে সাফল্যের সঙ্গে নেমে আসা; তবেই ভোক্তার আস্থার সঠিক মূল্যায়ন আমরা করতে পারব।

Leave A Reply

Your email address will not be published.